১. “দেশ ভ্রমিলে বাড়ে জ্ঞান, খুলে যায় সব দ্বার”
মানুষের জ্ঞান অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো দেশ ভ্রমণ। শুধু বই পড়ে সব ধরনের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব নয়। বই মানুষকে তাত্ত্বিক জ্ঞান দেয়, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা মানুষের জ্ঞানকে পরিপূর্ণ করে তোলে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, সমাজ, সংস্কৃতি ও মানুষের সঙ্গে পরিচিত হলে মানুষের চিন্তাশক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তার ঘটে। তাই প্রাচীনকাল থেকেই জ্ঞানীরা ভ্রমণের গুরুত্বের কথা বলেছেন। বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করলে মানুষ নতুন ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে। এতে মানুষের সংকীর্ণতা দূর হয় এবং উদার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
একজন ভ্রমণকারী প্রকৃতিকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ পায়। পাহাড়, নদী, সমুদ্র, বনভূমি ও গ্রামবাংলার সৌন্দর্য মানুষের মনকে আনন্দে ভরিয়ে তোলে। ভ্রমণ মানুষের একঘেয়েমি দূর করে এবং তাকে মানসিকভাবে সতেজ রাখে। তাছাড়া ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন দেশের মানুষের জীবনযাত্রা ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে পারে। এতে তার অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায়। তাই বলা হয়, “বিশ্বজোড়া পাঠশালা আমার, সবার আমি ছাত্র।” পৃথিবীর প্রতিটি স্থান যেন এক একটি শিক্ষার কেন্দ্র।
ভ্রমণ মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী করে তোলে। নতুন পরিবেশে চলাফেরা করতে গিয়ে মানুষ নানা সমস্যার সম্মুখীন হয় এবং সেগুলো সমাধান করতে শেখে। এতে তার বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা বৃদ্ধি পায়। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের উপর একটি শিশিরবিন্দু।” অর্থাৎ পৃথিবীর চারপাশেই ছড়িয়ে আছে শেখার অসংখ্য উপকরণ।
যে ব্যক্তি কখনো নিজের এলাকা ছেড়ে বাইরে যায় না, তার জ্ঞানের পরিধি সীমাবদ্ধ থেকে যায়। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করে, সে মানুষের আচরণ, সংস্কৃতি ও জীবনধারা সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান লাভ করে। এতে তার মন ও চিন্তার বিকাশ ঘটে। তাই বলা হয়, “দেশ ভ্রমিলে বাড়ে জ্ঞান, খুলে যায় সব দ্বার।” ভ্রমণ সত্যিই মানুষের জীবনের জ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়।
২. “বিশ্বজোড়া পাঠশালা আমার, সবার আমি ছাত্র”
এই পৃথিবী একটি বিশাল শিক্ষালয়। মানুষ কেবল বিদ্যালয় বা বই থেকে শিক্ষা লাভ করে না; বরং সমাজ, প্রকৃতি ও জীবনের নানা অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে। পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনা মানুষের জন্য নতুন কিছু শেখার সুযোগ এনে দেয়। একজন প্রকৃত শিক্ষার্থী সবসময় শেখার আগ্রহ রাখে এবং অন্যের কাছ থেকে ভালো কিছু গ্রহণ করতে দ্বিধা করে না। ছোট-বড়, ধনী-গরিব কিংবা শিক্ষিত-অশিক্ষিত—সব মানুষের কাছ থেকেই কিছু না কিছু শেখা যায়।
প্রকৃতি মানুষের অন্যতম বড় শিক্ষক। সূর্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে উদয় হয়ে মানুষকে সময়ানুবর্তিতার শিক্ষা দেয়। নদী শেখায় চলমান থাকতে, আর গাছ শেখায় নিঃস্বার্থভাবে অন্যের উপকার করতে। পিঁপড়া আমাদের পরিশ্রমের শিক্ষা দেয় এবং মৌমাছি শেখায় দলবদ্ধভাবে কাজ করতে। জীবনসংগ্রাম মানুষকে ধৈর্য, সাহস ও আত্মবিশ্বাস শেখায়। তাই পৃথিবীর প্রতিটি বিষয়ই মানুষের জন্য এক একটি শিক্ষা।
“জ্ঞান অর্জনের কোনো শেষ নেই”—এই সত্য আমাদের সবসময় মনে রাখতে হবে। যে ব্যক্তি নিজেকে সবজান্তা মনে করে, তার জ্ঞান বৃদ্ধি পায় না। কিন্তু যে ব্যক্তি নিজেকে ছাত্র মনে করে, সে প্রতিনিয়ত নতুন কিছু শেখে। মহান ব্যক্তিরাও আজীবন শিক্ষার্থী ছিলেন। তারা সবসময় নতুন জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা করেছেন।
বর্তমান যুগে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে মানুষ পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের জ্ঞান সহজেই অর্জন করতে পারছে। ইন্টারনেট, বই, সংবাদপত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যম মানুষের জ্ঞানার্জনের সুযোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই আমাদের উচিত অহংকার ত্যাগ করে সবার কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। পৃথিবী সত্যিই এক বিশাল পাঠশালা এবং আমরা সবাই তার ছাত্র।
৩. “পরিশ্রমই উন্নতির মূল”
জীবনে সফলতা ও উন্নতির প্রধান চাবিকাঠি হলো পরিশ্রম। পৃথিবীতে কোনো মহান ব্যক্তি পরিশ্রম ছাড়া সফল হতে পারেননি। কঠোর পরিশ্রমই মানুষকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দেয়। ছাত্রের ভালো ফল, কৃষকের ভালো ফসল কিংবা ব্যবসায়ীর উন্নতি—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে পরিশ্রম। অলস ব্যক্তি কখনো জীবনে সফল হতে পারে না। তাই বলা হয়, “পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি।”
পরিশ্রম মানুষকে আত্মবিশ্বাসী ও স্বনির্ভর করে তোলে। যে ব্যক্তি নিষ্ঠা ও ধৈর্যের সঙ্গে কাজ করে, সে একদিন না একদিন সফল হয়ই। অনেক সময় সফলতা পেতে দেরি হতে পারে, কিন্তু পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। “কষ্ট ছাড়া কেষ্ট মেলে না”—এই প্রবাদটিও আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।
প্রকৃতির দিকে তাকালেও আমরা পরিশ্রমের গুরুত্ব বুঝতে পারি। ক্ষুদ্র পিঁপড়া কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে খাদ্য সংগ্রহ করে। মৌমাছি নিরলস পরিশ্রম করে মধু তৈরি করে। কৃষক সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মাঠে কাজ করেন বলেই আমরা খাদ্য পাই। শ্রমিকের পরিশ্রমে গড়ে ওঠে বড় বড় ভবন ও শিল্পকারখানা।
পরিশ্রম শুধু অর্থনৈতিক উন্নতি নয়, মানসিক উন্নতিও ঘটায়। পরিশ্রমী মানুষ আত্মসম্মান ও মর্যাদা লাভ করে। অন্যদিকে অলস ব্যক্তি সমাজে অবহেলিত হয়। তাই জীবনে বড় হতে হলে অলসতা ত্যাগ করে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। মনে রাখতে হবে, “পরিশ্রমই উন্নতির মূল।”
৪. “চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ”
মানুষের জীবনে চরিত্র সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। অর্থ-সম্পদ, জ্ঞান বা ক্ষমতা থাকলেও চরিত্র না থাকলে মানুষ প্রকৃত সম্মান লাভ করতে পারে না। একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার চরিত্রের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সৎ, ভদ্র ও নৈতিক গুণসম্পন্ন মানুষ সমাজে সম্মান লাভ করে এবং সবার ভালোবাসা অর্জন করে।
অর্থ হারালে তা আবার ফিরে পাওয়া যায়, কিন্তু চরিত্র নষ্ট হলে মানুষের সম্মান নষ্ট হয়ে যায়। চরিত্রবান ব্যক্তি সবসময় সত্য কথা বলে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় এবং মানুষের কল্যাণে কাজ করে। তাই বলা হয়, “ধন নয়, মানই মানুষের আসল পরিচয়।” মহান ব্যক্তিদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তাদের সুন্দর চরিত্রই তাদের প্রকৃত মর্যাদা এনে দিয়েছে।
ছাত্রজীবন থেকেই সুন্দর চরিত্র গঠন করা প্রয়োজন। মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা কিংবা অন্যায় কাজ করা মানুষের চরিত্র নষ্ট করে দেয়। অন্যদিকে সততা, নম্রতা ও দায়িত্ববোধ মানুষের চরিত্রকে উন্নত করে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
একজন চরিত্রবান মানুষ সমাজের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। সবাই তাকে সম্মান করে এবং তার ওপর আস্থা রাখে। তাই আমাদের উচিত সুন্দর চরিত্র গঠনের জন্য ছোটবেলা থেকেই নৈতিক শিক্ষার চর্চা করা। কারণ চরিত্রই মানুষের প্রকৃত সম্পদ।
৫. “দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য”
শুধু জ্ঞানী হলেই মানুষ ভালো হয় না। যদি তার চরিত্র খারাপ হয়, তবে সে সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়ে উঠতে পারে। দুর্জন ব্যক্তি নিজের স্বার্থের জন্য অন্যের ক্ষতি করতে দ্বিধা করে না। তাই সে যত বড় বিদ্বানই হোক না কেন, তাকে এড়িয়ে চলাই ভালো। কারণ জ্ঞান তখনই মূল্যবান, যখন তা মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। অন্যথায় সেই জ্ঞান সমাজের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই বলা হয়, “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।”
ইতিহাসে এমন অনেক শিক্ষিত ও জ্ঞানী ব্যক্তির উদাহরণ পাওয়া যায়, যারা তাদের জ্ঞানকে অন্যায় কাজে ব্যবহার করেছেন। ফলে সমাজে অশান্তি ও ক্ষতির সৃষ্টি হয়েছে। একজন দুর্জন ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ভদ্র ও শিক্ষিত হলেও তার অন্তরে থাকে হিংসা, অহংকার ও স্বার্থপরতা। সে সুযোগ পেলেই অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করে। তাই কেবল বিদ্যা দিয়ে মানুষকে বিচার করা উচিত নয়; তার চরিত্র ও আচরণও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রকৃত শিক্ষা মানুষের মধ্যে মানবতা, সততা ও নৈতিকতা সৃষ্টি করে। যে ব্যক্তি শিক্ষিত হয়েও মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে বা অন্যায়ের পথ অনুসরণ করে, সে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত নয়। মহান ব্যক্তিরা সবসময় সৎ ও নীতিবান মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করতে বলেছেন। কারণ মানুষের চরিত্র তার সঙ্গের মাধ্যমেও প্রভাবিত হয়।
ছাত্রজীবনে ভালো বন্ধুর গুরুত্ব অনেক বেশি। খারাপ সঙ্গ একজন ভালো মানুষকেও বিপথে পরিচালিত করতে পারে। তাই আমাদের উচিত দুর্জন ও অসৎ ব্যক্তিকে পরিহার করা এবং সৎ ও নীতিবান মানুষের সান্নিধ্যে থাকা। মনে রাখতে হবে, খারাপ মানুষের জ্ঞান সমাজের জন্য কল্যাণকর নয়। তাই “দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য।”
৬. “সঙ্গদোষে লোহা ভাসে”
মানুষের জীবনে সঙ্গের প্রভাব অত্যন্ত গভীর। মানুষ সাধারণত তার সঙ্গীদের আচরণ, অভ্যাস ও চিন্তাধারার দ্বারা প্রভাবিত হয়। ভালো সঙ্গ মানুষকে সৎ ও সুন্দর পথে পরিচালিত করে, আর খারাপ সঙ্গ মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়। যেমন লোহা নিজে ভাসতে পারে না, কিন্তু নৌকার সঙ্গে থাকলে ভাসে; তেমনি ভালো মানুষের সংস্পর্শ একজন মানুষকে উন্নতির পথে নিয়ে যেতে পারে।
ছাত্রজীবনে বন্ধুবান্ধবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ভালো বন্ধুরা মানুষকে পড়াশোনা, শৃঙ্খলা ও ভালো কাজে উৎসাহিত করে। অন্যদিকে খারাপ বন্ধুরা মানুষকে মিথ্যা বলা, অলসতা ও অন্যায়ের পথে পরিচালিত করে। তাই বলা হয়, “সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ।” একজন মেধাবী ছাত্রও খারাপ সঙ্গের কারণে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
মানুষ সাধারণত তার পরিবেশ ও সঙ্গের মতো হয়ে ওঠে। যদি কেউ সবসময় সৎ ও গুণী মানুষের সঙ্গে মিশে, তবে তার মধ্যেও ভালো গুণের বিকাশ ঘটে। অন্যদিকে খারাপ মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করলে মানুষের চরিত্র নষ্ট হয়ে যায়। তাই পরিবার ও সমাজের উচিত শিশুদের ভালো পরিবেশ ও সৎ সঙ্গ নিশ্চিত করা।
প্রকৃত বন্ধুই মানুষকে ভালো পথে পরিচালিত করে। ভালো বন্ধু বিপদের সময় সাহায্য করে এবং ভুল করলে তা সংশোধন করার উপদেশ দেয়। তাই বন্ধুত্ব করার সময় সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। জীবনে সফল ও সম্মানিত হতে হলে ভালো মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করতে হবে এবং অসৎ সঙ্গ এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ সঙ্গ মানুষের চরিত্র ও ভবিষ্যৎ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৭. “বৃক্ষ তার ফলে পরিচয়, মানুষ তার কর্মে”
একটি গাছকে তার ফল দেখে যেমন চেনা যায়, তেমনি মানুষকে তার কাজের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। মানুষের কথার চেয়ে কাজ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেউ নিজেকে যতই ভালো বলে পরিচয় দিক না কেন, তার প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তার কাজের মাধ্যমে। যে ব্যক্তি ভালো কাজ করে, সমাজে সে সম্মান লাভ করে। অন্যদিকে, খারাপ কাজ মানুষের সম্মান নষ্ট করে। তাই বলা হয়, “কর্মই মানুষের পরিচয়।”
ইতিহাসে যেসব মহান মানুষ আজও স্মরণীয় হয়ে আছেন, তারা তাদের মহৎ কর্মের কারণেই অমর হয়ে আছেন। কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান—তাদের কর্মই তাদের মানুষের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। অন্যদিকে যারা অন্যায় ও খারাপ কাজ করেছে, মানুষ তাদের ঘৃণার চোখে দেখে।
মানুষের উচিত এমন কাজ করা, যা সমাজ ও দেশের উপকারে আসে। অলস ও কর্মহীন মানুষ সমাজে কোনো মর্যাদা পায় না। পরিশ্রম, সততা ও দায়িত্ববোধ মানুষকে কর্মে সফল করে তোলে। ছাত্রের কাজ হলো মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা, আর একজন নাগরিকের দায়িত্ব হলো দেশের কল্যাণে কাজ করা।
শুধু মুখে বড় বড় কথা বললে মানুষ সম্মান পায় না। ভালো কাজের মাধ্যমেই মানুষ নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তাই আমাদের উচিত সবসময় সৎ ও কল্যাণকর কাজ করা। কারণ মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার কর্মের মধ্যেই প্রকাশ পায়।
৮. “বিনয়ী মানুষই প্রকৃত জ্ঞানী”
প্রকৃত জ্ঞানী মানুষ কখনো অহংকার করেন না। তারা সবসময় ভদ্র, নম্র ও বিনয়ী আচরণ করেন। জ্ঞান মানুষের মধ্যে বিনয় সৃষ্টি করে এবং মানুষকে মহান করে তোলে। যে ব্যক্তি সামান্য জ্ঞান পেয়েই অহংকার করে, সে প্রকৃত জ্ঞানী নয়। তাই বলা হয়, “ফলবান বৃক্ষ সর্বদা নত থাকে।” অর্থাৎ যে মানুষ সত্যিকারের গুণী ও জ্ঞানী, সে সবসময় বিনয়ী হয়।
মহান ব্যক্তিদের জীবনী পড়লে দেখা যায়, তারা কখনো অহংকার করেননি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন, কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বরা সবসময় নম্র ও বিনয়ী ছিলেন। তারা জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন।
বিনয় মানুষের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং অন্যের ভালোবাসা অর্জন করতে সাহায্য করে। অহংকারী মানুষ সমাজে অপছন্দের পাত্র হয়ে ওঠে। কারণ অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। অন্যদিকে বিনয়ী মানুষ সহজেই সবার শ্রদ্ধা ও সম্মান লাভ করেন। তারা অন্যের মতামতকে মূল্য দেন এবং সবার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করেন।
বর্তমান সমাজে অনেক মানুষ সামান্য সফলতা পেয়েই অহংকার করতে শুরু করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, অহংকার পতনের মূল। মানুষ যত বড়ই হোক না কেন, তার বিনয়ী হওয়া উচিত। কারণ বিনয় মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে এবং তাকে সবার প্রিয় করে তোলে। তাই প্রকৃত জ্ঞানী হতে হলে বিনয়ী হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন।
৯. “দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ”
একতা মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। সবাই মিলে কাজ করলে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। দলবদ্ধভাবে কাজ করলে সফলতার সম্ভাবনা অনেক বৃদ্ধি পায়। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই বলা হয়, “একতাই বল।” মানুষ একা বড় কোনো কাজ সম্পন্ন করতে পারে না; সহযোগিতার মাধ্যমেই বড় সাফল্য অর্জন সম্ভব।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও দলগত কাজের গুরুত্ব অনেক। বিদ্যালয়ে দলবদ্ধভাবে খেলাধুলা বা কোনো কাজ করলে তা সহজ ও আনন্দদায়ক হয়। সমাজের উন্নয়নমূলক কাজ, যেমন রাস্তা নির্মাণ, শিক্ষা বিস্তার বা দুর্যোগ মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হয়। একতার মাধ্যমেই একটি জাতি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
একটি কাঠি সহজেই ভেঙে ফেলা যায়, কিন্তু অনেকগুলো কাঠি একসঙ্গে বাঁধা থাকলে তা ভাঙা কঠিন হয়। এই উদাহরণ থেকেই একতার শক্তি বোঝা যায়। ইতিহাসে দেখা যায়, যেসব জাতি ঐক্যবদ্ধ ছিল, তারা উন্নতি ও সফলতা অর্জন করেছে। অন্যদিকে বিভেদ ও হিংসা একটি জাতিকে দুর্বল করে দেয়।
কোনো কাজে জয় বা পরাজয় থাকতেই পারে, কিন্তু মিলেমিশে কাজ করার মানসিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দলগত কাজ মানুষকে দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল করে তোলে। তাই আমাদের উচিত সব বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করা এবং সমাজ ও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখা।
১০. “ফলবতী বৃক্ষ যেমন নিচের দিকে নুয়ে পড়ে, তেমনি গুণী মানুষ সবসময় বিনয়ী হন”
যে গাছে বেশি ফল ধরে, সেই গাছ নিচু হয়ে যায়। তেমনি সত্যিকারের গুণী মানুষ কখনো অহংকার করেন না। তারা সবসময় নম্র, ভদ্র ও বিনয়ী থাকেন। জ্ঞান, গুণ ও মর্যাদা মানুষকে আরও বিনয়ী করে তোলে। তাই বলা হয়, “অহংকার পতনের মূল।” অহংকারী ব্যক্তি মানুষের ভালোবাসা হারায়, কিন্তু বিনয়ী ব্যক্তি সবার শ্রদ্ধা ও সম্মান অর্জন করেন।
মহান ব্যক্তিদের জীবনীতে দেখা যায়, তারা যত বড় হয়েছেন, তত বেশি বিনয়ী হয়েছেন। তারা কখনো নিজেদের বড় মনে করেননি। বরং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভদ্র আচরণ করেছেন এবং সবার মতামতকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এই কারণেই মানুষ তাদের আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
অহংকার মানুষকে অন্ধ করে দেয়। অহংকারী ব্যক্তি নিজের ভুল বুঝতে পারে না এবং অন্যকে তুচ্ছ মনে করে। ফলে একসময় সে সমাজে অপমানিত হয়। অন্যদিকে বিনয়ী মানুষ সহজেই সবার হৃদয় জয় করতে পারেন। তাদের ব্যবহার ও নম্রতা মানুষকে আকৃষ্ট করে।
বিনয় মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। এটি মানুষের চরিত্রকে সুন্দর করে এবং সমাজে মর্যাদা বৃদ্ধি করে। তাই আমাদের উচিত অহংকার ত্যাগ করে গুণী মানুষের মতো বিনয়ী হওয়া। কারণ প্রকৃত জ্ঞান ও গুণ মানুষকে সবসময় নম্র করে তোলে।